Tuesday, December 3, 2013

পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ



বিদ্যুত্-জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সহায়ক বায়োগ্যাস

বগুড়ায় বর্জ্য থেকে উত্পাদিত বায়োগ্যাস দিয়েই এখন থেকে চলবে গাড়ি। মিটবে বাসাবাড়ির জ্বালানি সমস্যা। মানুষ গবাদিপশুর মলমূত্র কাজে লাগিয়ে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা এই প্রযুক্তি আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও খুব শিগগিরই এর পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। আর এটা করা গেলে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা আয় বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি ঋণ গ্রহণের সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে কমিউনিটি বায়োগ্যাস প্রকল্প। গত শুক্রবার একাডেমি চত্বরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বায়োগ্যাসের এই প্রকল্প এবং কার্যকারিতা দেখে এসেছেন

আরডিএ উপ-পরিচালক সমির কুমার সরকার জানান, যে কোনও পচনশীল বস্তু যেমনমানুষ পশুপাখির মলমূত্র, গৃহস্থালির আবর্জনা বাতাসের অনুপস্থিতিতে পচানো হলে এক ধরনের রংবিহীন গ্যাস তৈরি হয়। একে ইংরেজিতে বলা হয় বায়োজিক্যাল মেটারিয়াল আর বাংলায় বায়োগ্যাস। বায়োগ্যাসে শতকরা ৪০ থেকে ৬০ ভাগ মিথেন থাকে ফলে এই গ্যাস শহরাঞ্চলে সরবরাহকৃত গ্যাসের মতোই জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। বায়োগ্যাসে রান্না ধোঁয়া কালিমুক্ত

তিনি জানান, এই গ্যাস শুধু যে রান্নার কাজেই ব্যবহূত হয় তা নয়, এটা দিয়ে জেনারেটর চালিত বিদ্যুত্ উত্পাদন করে বৈদ্যুতিক নানা রকমের সরঞ্জাম চালানো যায়। এটা সিলিন্ডারে ভরে সরবরাহ করা যায়। সিএনজি রূপান্তরিত গাড়ি চালানো যায়। এই গ্যাস পচনশীল দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য থেকে তৈরি হওয়ার কারণে পোলিও, টাইফয়েড, যক্ষ্মা পরজীবীর মতো রোগজীবাণু ধ্বংস করে। তিনি জানান, বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে উত্পাদিত গ্যাস প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করে বাড়ি ঘরে চুলায় রান্না-বান্না করা ছাড়াও সিলিন্ডারে বোতলবন্দি করা হয়েছে। সিএনজি স্টেশন বসানোর কাজও শেষ হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে মোটরযানেও এই গ্যাস দিতে সক্ষম হবে আরডিএ

আরডিএর তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে গরু মহিষের সংখ্যা ২২ মিলিয়ন। দৈনিক গড়ে ১০ কেজি হিসেবে গরু/মহিষ থেকে গোবর পাওয়া যায় ২২০ মিলিয়ন কেজি। প্রতি কেজি গোবর থেকে .০৩৬ ঘন মিটার হিসেবে বছরে প্রায় .৯২ মিলিয়ন ঘন মিটার বায়োগ্যাস পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়ার বিষ্ঠা, মানুষের মলমূত্র, আবর্জনা, কচুরিপানা থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বায়োগ্যাস পাওয়া সম্ভব। পরিবারের ল্যাট্রিন বায়োগ্যাস প্লান্টের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলে মানুষের মলমূত্রসহ অন্যান্য পচনশীল বর্জ্য বায়োগ্যাস প্লান্টে ব্যবহূত হবে। এতে বিপুল পরিমাণ উত্কৃষ্টমানের জৈব সার বায়োগ্যাস পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এনে দিতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ। এছাড়া গ্রিন হাউজ গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি  হ্রাসকরণেও বায়োগ্যাস প্রযুক্তি বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে

আরডিএর মহাপরিচালক আব্দুল মতিন জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে গ্যাসের কোনও সংকট থাকবে না। গাড়িতে এই গ্যাস ব্যবহার করা একেবারেই নিরাপদ। সরকার মোট ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আরডিএকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্লান্ট স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। তিনি জানান, কমিউনিটি বায়োগ্যাস প্রকল্প দেশের ৭টি বিভাগের ৩৬টি জেলায় ১১২টি স্থানে স্থাপন করা হবে। এরমধ্যে রংপুরে ৩১টি, রাজশাহীতে ৩৮টি, ঢাকায় ২০টি, খুলনায় ১২টি, চট্টগ্রামে ৪টি, বরিশালে ৩টি এবং সিলেটে ৪টি স্থান রয়েছে। ইতোমধ্যেই এই প্রকল্পে বছরে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ মিলেছে। আর কমিউনিটি বায়োগ্যাস প্রকল্প করা হয়েছে ৪০টি। বাকিগুলো স্থাপনের কাজ চলছে

প্রকল্পটির সমা্ভব্যতা সম্পর্কে জানা যায়, একটি গ্রামে একটি বায়োগ্যাসের প্রকল্প থাকবে। সেখানে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের বর্জ্য এবং গোবর জমা করা হবে। সেখান থেকে প্রতিটন গোবর থেকে মিলবে ১০০০ ঘটফুট গ্যাস। সেই গ্যাস প্রসেস করে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পর ৫০০ ঘনফুট টিকবে। আর গ্যাস বের করে নেওয়ার পর যে সার পড়ে থাকবে তা কৃষকের কাছ থেকে কিনে নেওয়া হবে প্রতিটন হাজার টাকায় কৃষক ইচ্ছে করলে সেই সার নিজেরাও ব্যবহার করতে পারবে